বুর্জোয়া রাজনীতি-মুক্ত
শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলুন!
বুর্জোয়া রাজনীতি-মুক্ত
শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলুন!
আন্দোলন প্রতিবেদন
শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬ | অনলাইন সংস্করণ
জুলাই/২৪-এর অভ্যুত্থানের পর গঠিত হাসিনা-আওয়ামী ব্যতীত সকল বুর্জোয়া পার্টি ও শক্তির সমর্থিত “তৃতীয় শক্তি”র ইউনূস সরকার বিদায় নিয়েছে এবং বুর্জোয়া নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এরা সবাই জুলাই অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব জাহির করে দেখাতে চায় যে, দেশ মুক্ত হয়েছে, জনগণ ক্ষমতা পেয়েছে, জনগণের স্বার্থে কাজ চলছে।
কিন্তু ইতিমধ্যে তাদেরই ভেতর থেকে হতাশার কথাও প্রকাশ পাচ্ছে। বিভিন্ন মহলই স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে যে, জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। দেশের মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি। এমনকি জামাত-এনসিপি বিএনপিকে লক্ষ্য করে নব্য ফ্যাসিবাদ, আরেকটি বিপ্লব ও সরকার উচ্ছেদের আন্দোলনের কথাও বলছে। বিএনপিও বলছে ওরা রাজাকার।
বাস্তবে শ্রমিক কৃষক ও শ্রমজীবী দরিদ্র জনগণ যেখানে ছিলেন সেখানেই রয়েছেন। বরং নিত্যনতুন সংকট তাদের জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলেছে। এর মূল কারণ হলো যে-ব্যবস্থাকে এদেশের শাসকশ্রেণি বিগত ৫ দশকের বেশি সময় ধরে চালিয়ে এসেছে তার কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। শাসকশ্রেণি ও তাদের রাষ্ট্র-চরিত্রের কোনো পরিবর্তন হয়নি। মাঝে মাঝে কিছু কিছু রূপ বদল করে করে এটা চলছে। বুর্জোয়া রাজনীতি জনগণের আন্দোলন লড়াই অভ্যুত্থানের সাথে সর্বদাই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তারা শ্রমিক কৃষক জনগণের দাবি ও কর্মসূচিকে হয় আনেনি, নতুবা আটকে দিয়েছে। এজন্য এ নিপীড়িত শোষিত জনগণের কর্তব্য হলো বুর্জোয়া রাজনীতির থেকে মুক্ত শ্রমিক কৃষকের স্বতন্ত্র আন্দোলন গড়ে তোলা। আমরা নিচে বিভিন্ন সেক্টরে শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের প্রয়োজন ইস্যু ও পরিস্থিতিকে কিছুটা তুলে ধরবো।
শ্রমিক শ্রেণির জন্য নতুন পে-স্কেল চাই
সরকারি আমলা ও কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছে। কয়েক ধাপে তাদের বেতন প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের উচ্চবৃদ্ধির পরিস্থিতিতে এটা অন্যায্য নয়। তবে প্রথম দিককার গ্রেডের অফিসারদের বেতন এতটা বৃদ্ধি কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। যেখানে সরকারের অর্থ পরিস্থিতি ভালো নয়। প্রায় ২৬ লক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য বছরে ১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি অর্থ অতিরিক্ত লাগবে। যাহোক, আমলাতন্ত্রকে সরকার হাতে রাখতে চায়। কিন্তু আওয়ামী ও জামাত-ধর্মবাদী আমলারা কতটা বিএনপি’র পক্ষে আসবে সেটা আগামীতে দেখার।
অথচ কৃষকের জন্য বা স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাখাতে ভতুর্কির হার খুবই কম। আর শ্রমিক শ্রেণির কথা কি সরকারের মনে ছিল না? শুধুমাত্র গার্মেন্ট খাতেই ২৫ লক্ষের মতো নারী-শ্রমিকসহ প্রায় ৪০ লক্ষ শ্রমিক-কর্মচারী কর্মরত। গার্মেন্ট ছাড়া চা-শ্রমিক, অন্যান্য শিল্প-শ্রমিক, পরিবহণ শ্রমিক রয়েছেন প্রায় কোটি ছাড়িয়ে। তারা এখন বাজারে গিয়ে আরো বেশি করে মূল্যবৃদ্ধির খপ্পরে পড়বেন। কারণ, উপরোক্ত ১ লক্ষ কোটি টাকা এখন বাজারে আসবে, আর দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেবে। এ অবস্থায় তাদের জীবন-নির্বাহ করা আরো দুস্কর হয়ে পড়বে।
সরকার, বুর্জোয়া রাজনীতি, শাসকশ্রেণি ও রাষ্ট্র এই শ্রমিক-কৃষক-দরিদ্র ও সাধারণ জনগণের নয়, এটা এই পে-স্কেল থেকেই বোঝা যায়। তাই, শ্রমিক শ্রেণিকে তাদের জন্য নতুন পে-স্কেল ঘোষণার দাবিতে দ্রুত আন্দোলনের পথে নামতে হবে। আন্দোলন ছাড়া শ্রমিক শ্রেণি কখনো কোনো দাবি আদায় করতে পারেননি।
অটো রিক্সা বন্ধ করার চক্রান্ত রুখে দিন
ব্যাটারি চালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকার সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে চালক ও মালিকদের মধ্যে উদ্বেগ-ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এসব যান নিয়ন্ত্রণ, নিবন্ধন, চলাচলের এলাকা নির্ধারণ এবং উৎপাদন ও চার্জিং ব্যবস্থার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকার বলছে, যানজট, দুর্ঘটনা, বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও সড়কে বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের জন্য এসব পদক্ষেপ প্রয়োজন।
দেশে প্রায় ৬০/৮০ লক্ষ ও ঢাকা মহানগরে ১০/১৫ লক্ষ অটো রিক্সা রয়েছে বলে তথ্য জানানো হচ্ছে। এসবে কম করেও ১ কোটি মানুষ কর্মরত। একটি অটোর দাম দেড় লক্ষ টাকা ধরা হলে প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকা এখানে বিনিয়োজিত রয়েছে। কয়েক লক্ষ ছোটো মালিক এখানে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। দেশে যেখানে গুরুতর বেকার সমস্যা চলছে সেখানে এমন একটি শ্রম-ঘন খাত হঠাৎ করে বন্ধ করার লক্ষ্যে কেন এসব পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার?
বুর্জোয়া অর্থনীতির একটি মূল সূত্র হলো চাহিদা থাকলে সরবরাহ হয়। এই যে ৬০/৭০ লক্ষ অটো রিক্সা চলছে, তার বিরাট চাহিদা দেশে রয়েছে বলেই ব্যাঙের ছাতার মতো এর বিকাশ হয়েছে। সে চাহিদা হলো– সাধারণ মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে ব্যাপক জনগণের পরিবহণের চাহিদা। জনগণের এ প্রয়োজন রাষ্ট্র ও বুর্জোয়া শ্রেণি বিগত বছরগুলোতে মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলেই অটো রিক্সার এত ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।
অটো রিক্সার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো করা হচ্ছে এবং বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা দুই হাত তুলে যার পক্ষ-সমর্থন করছে সেগুলোর মধ্যে একটি হলো দুর্ঘটনা। কিন্তু বিআরটি’র সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ মোটর সাইকেল। তারপর রয়েছে ট্রাক, বাস......ইত্যাদি। অটো রিক্সা এখানে ৬নং স্থানে রয়েছে।
আরেকটি অভিযোগ হলো অটো রিক্সা রাস্তা দখল করে রেখেছে। প্রতিবেদন বলছে, রাস্তা ও জায়গা দখলের জন্য প্রধানত দায়ী প্রাইভেট কার।
কিন্তু অদ্ভূত বিষয় হলো, মোটর সাইকেল বা প্রাইভেট কার নিষিদ্ধের কোনো দাবি কেউ তুলছে না।
বিদ্যুতের ক্ষেত্রে বলা যায়, অটো চালকরা প্রত্যেকেই বিদ্যুতের জন্য দাম পরিশোধ করেন। সেটা আদায় করে গ্যারেজ মালিকরা। সে অর্থ রাষ্ট্র কেন তুলতে পারে না, কারণ, এ ধরনের গ্যারেজ মালিকদের একটা বড়ো অংশ হলো স্থানীয় ভাবে বুর্জোয়া দলগুলোর ভিত্তি। এ খাতে নাকি বিদ্যুতের ৪% খরচ হয়। এত বড় একটি কর্মক্ষেত্র যদি মাত্র ৪% বিদ্যুৎ খরচ করে, তাহলে আতঙ্কিত হবার কী আছে? গার্মেন্ট খাতে এর চেয়ে কম কর্ম-সংস্থান হয়েছে, কিন্তু তারা বিদ্যুৎ নিচ্ছে এর চেয়ে অনেক বেশি।
তাদের লাইসেন্স নেই। ঠিক আছে, আপনারা লাইসেন্স দিচ্ছেন না কেন? লাইসেন্স ফি এবং বাৎসরিক নবায়ন ফি দিয়ে সরকারও তো লাভবান হতে পারে। সেটা করছে না কেন?
এখন বলতে হয় যে, ভাত দেবার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই। প্রায় এক কোটি শ্রমজীবী মানুষকে এ রাষ্ট্র ও শাসকশ্রেণি উপযুক্ত কর্ম-সংস্থান করে দিতে পারে না। অথচ তাদেরকে বেকার করা, ছোট মালিকদেরকেও পথে বসানো, বিশাল জনগোষ্ঠীকে পরিবহণের সমস্যায় ফেলার কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে? জনগণের শত্রু বড়বুর্জোয়া গাড়ি-আমদানিকারক, গাড়ি-মালিক, আমলা ও সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থ রক্ষাই এর উদ্দেশ্য।
অটো রিক্সা শ্রমিক ও মালিকদেরকে যৌথভাবে এ চক্রান্তকে রুখে দিতে হবে।
পূনর্বাসনবিহীন হকার উচ্ছেদ মানি না
রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে অস্থায়ী দোকান এবং হকার উচ্ছেদ চলছে। গত জুলাইয়ের শুরু থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সংলগ্ন রাস্তার ফুটপাথে এবং রমনা কালীমন্দিরের সামনে থেকে হকার-অস্থায়ী দোকান উচ্ছেদ অভিযান চলমান। এর মধ্যে কয়েকজন হকার-দোকান কর্মচারীকে গ্রেফতার করে কারাদণ্ডও দেয়া হয়। একই সময়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, শহীদ মিনার এলাকা, প্রেস ক্লাব, জুরাইন, কারওয়ান বাজার মেট্রো স্টেশনের নিচেও হকারদের উচ্ছেদ করা হয়।
উচ্ছেদের কারণে ভবিষ্যৎ আয়-উপার্জন-কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা-উৎকণ্ঠায় আছেন এইসব হকাররা। অনেক হকারের যন্ত্রপাতি-গাড়ির ক্ষতির পরিমাণ লক্ষাধিক টাকা। ধরপাকড়-উচ্ছেদের সময় রাষ্ট্রের পুলিশবাহিনীর হাতে শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অনেকে।
জোরপূর্বক উচ্ছেদের মুখে বিভিন্ন জায়গায় দোকানদার-হকার-শ্রমিকদের প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযানের সময় পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে জুরাইনে গত ২৬ জুলাই হকাররা পুলিশের ওপর জুতা নিক্ষেপ করেন। এ ঘটনায় ২ জন হকারকে গ্রেফতার করা হয়।
কৃষিজমি সংকোচন এবং ফসল নষ্ট হওয়া, কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই, বেকারত্বসহ নানাবিধ সমস্যার মুখে হকার হওয়া বিশালসংখ্যক মানুষের জীবিকার কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না করে জোরপূর্বক উচ্ছেদে পরিষ্কার হয় প্রশাসন-সরকার-রাষ্ট্রের গণবিরোধী চরিত্র। হকারদের উচ্ছেদ করে শহরের নিম্ন আয়ের এবং মধ্যবিত্ত জনগণের প্রয়োজনের ওপরও চরম আঘাত করা হচ্ছে; তাদেরকে উচ্চমূল্যের সুপারমার্কেটের দিকে ঠেলে দিয়ে কর্পোরেট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে।
কর্পোরেট ব্যবসায়ীগোষ্ঠী, ধণিকশ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী রাষ্ট্রব্যবস্থা অটুট রেখে হকারসহ শ্রমজীবী এবং মধ্যবিত্তসহ নিপীড়িত জনগণের জীবনের সংকট নিরসন সম্ভব নয়। হকারসহ নিপীড়িত জনগণের বিদ্যমান এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিপ্লবী সংগ্রামের মাধ্যমে সমাজের আমূল পরিবর্তনেই কেবল মুক্তি সম্ভব।
সরকারি কল-কারখানা বেসরকারিকরণ চলবে না!
সম্প্রতি বিএনপি সরকার বন্ধ পাটকল-চিনিকলসহ ৪৪টি শিল্পকারখানা দেশি-বিদেশি লুটেরাদের হাতে তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতিমধ্যে দেশের শ্রমিক-জনতার তীব্র বিরোধিতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কয়েকটি পাটকল হস্তান্তরের গণবিরোধী চুক্তিও সেরে ফেলেছে। “বিনিয়োগ ও বেকারত্ব নিরসন”-এর নামে দশ হাজার একরেরও বেশি জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত শিল্প-কারখানা “পূনর্গঠন ও পুনউন্নয়ন” ইত্যাদি ভুয়া বয়ানে জনগণের এই বৃহৎ ভূমি-সম্পদ-অবকাঠামো পানির দরে দেশি-বিদেশি কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে সরকার। এর থেকে আমলারা হাতিয়ে নিচ্ছে শত শত কোটি টাকা। কিন্তু এ সব শিল্প-কারখানায় কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারী-ভোক্তাদের সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের নিকট জিম্মি করে ফেলা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এর প্রেসক্রিপশনে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে। দেশকে বেশি করে সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর করে তুলছে।
গার্মেন্টগুলোতে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ কর!
বর্তমানের বাংলাদেশে শাসকশ্রেণি ও সাম্রাজ্যবাদীরা গড়ে তুলেছে বিরাট গার্মেন্ট শিল্প সেক্টর। গার্মেন্ট শ্রমিকদের শ্রম শোষণ করেই দেশি-বিদেশি মালিকগোষ্ঠী কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছে। বিলাসী জীবন-যাপন করছে। স্থানীয় ভূমি-মালিকরা বাড়িওয়ালা বনে গেছে, আর তারা দরিদ্র শ্রমিকদের নিংড়ে নিয়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। অথচ শ্রমিকশ্রেণি অত্যন্ত মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।
৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর আওয়ামী মালিকরা অসংখ্য গার্মেন্ট বন্ধ করে শ্রমিকের বেতন পরিশোধ না করে পালিয়ে যায়। ইউনূস সরকার শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ ও তাদের কর্মসংস্থানের কোনো ব্যবস্থা না করে শ্রমিক আন্দোলনকে উল্টো সেনা ও পুলিশ লেলিয়ে দিয়ে হত্যাসহ অগণিত শ্রমিকদের রক্তাক্ত করে।
তথাকথিত নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও বন্ধ ফ্যাক্টরি চালু করা ও চাকরি হারানো শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। বরং প্রতিদিন ফ্যাক্টরিগুলো থেকে শত-সহস্র শ্রমিককে বিনা নোটিশে ছাঁটাই করে হচ্ছে। দ্বিগুণ তিনগুণ টার্গেট দিয়ে দুই জনের কাজ একজনকে দিয়ে করিয়ে দিচ্ছে। কোনো কোনো মালিক তো রোবট আমদানি করার হুমকি দিয়ে শ্রমিকদের আতঙ্কগ্রস্ত করে রাখছে।
চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনের পাশে দাঁড়ান
দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি, ভূমির অধিকার, শ্রমিক ইউনিয়নের গণতান্ত্রিক নির্বাচন, শ্রমিক-স্বার্থবিরোধী বিধান বাতিল এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার দাবিতে চা-শ্রমিকরা আন্দোলন করছেন। মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন চা-বাগানের শ্রমিকরা কর্মবিরতি-বিক্ষোভ-মানববন্ধন ও সমাবেশের মাধ্যমে তাদের দাবি তুলে ধরছেন। বর্তমানে চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১৮৭-১৯৬ টাকা। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে এই মজুরিতে চা-শ্রমিক ও তাদের পরিবার মধ্যযুগের ভূমিদাসদের মতো জীবন-যাপন করছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম চা-বাগানে বসবাস করলেও শ্রমিকদের বসতভিটার স্থায়ী মালিকানা নেই।
চা-শ্রমিকদের এই আন্দোলন কেবল মজুরি বৃদ্ধির দাবি নয়। এর সঙ্গে জড়িত শ্রমের মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, ভূমির অধিকার ও গণতান্ত্রিক শ্রমিক সংগঠনের প্রশ্ন। তাই চা-শ্রমিকদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখতে হবে। সকল প্রগতিশীল শক্তিকে আমরা চা-শ্রমিকদের আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি।
সার সংকটে কৃষকের নাভিশ্বাস
আমন মৌসুমে জমি প্রস্তুত ও চারা রোপণের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কৃষকেরা প্রয়োজনীয় ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার পাচ্ছেন না। কোথাও সার মিললেও সরকার-নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ফলে একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে সময়মতো সার প্রয়োগ করতে না পারায় ফসলের উৎপাদন নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় কৃষকরা সার কেনার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও সার পাচ্ছেন না।
সরকারি বরাদ্দের সার ডিলার সিন্ডিকেটরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে বিক্রি করছে। কোনো কোনো এলাকায় নির্ধারিত দামের তুলনায় প্রতি বস্তায় কয়েক’শ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিম্ন ও গরিব কৃষকেরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়ায় ক্ষুব্ধ কৃষকেরা গুদামের দরজা ভেঙে ১৯৭ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে গেছেন। যদিও প্রশাসনের ভয়ে অনেকেই পরে ফেরত দিয়েছেন।
কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে– দেশে সার সংকট নেই এবং পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। সরকার-দলীয় বা ক্ষমতার সাথে যুক্ত ডিলাররা সার মজুত করে বেশি দামে বিক্রির আশায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কৃষকদের হয়রানি করছে।
শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে এবং কৃষকের কর্মসূচির ভিত্তিতে সকল নিপীড়িত জনগণকে এই রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের লড়াই-সংগ্রামে শামিল হতে হবে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
বুর্জোয়া রাজনীতি-মুক্ত
শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলুন!
জুলাই/২৪-এর অভ্যুত্থানের পর গঠিত হাসিনা-আওয়ামী ব্যতীত সকল বুর্জোয়া পার্টি ও শক্তির সমর্থিত “তৃতীয় শক্তি”র ইউনূস সরকার বিদায় নিয়েছে এবং বুর্জোয়া নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এরা সবাই জুলাই অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব জাহির করে দেখাতে চায় যে, দেশ মুক্ত হয়েছে, জনগণ ক্ষমতা পেয়েছে, জনগণের স্বার্থে কাজ চলছে।
কিন্তু ইতিমধ্যে তাদেরই ভেতর থেকে হতাশার কথাও প্রকাশ পাচ্ছে। বিভিন্ন মহলই স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে যে, জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। দেশের মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি। এমনকি জামাত-এনসিপি বিএনপিকে লক্ষ্য করে নব্য ফ্যাসিবাদ, আরেকটি বিপ্লব ও সরকার উচ্ছেদের আন্দোলনের কথাও বলছে। বিএনপিও বলছে ওরা রাজাকার।
বাস্তবে শ্রমিক কৃষক ও শ্রমজীবী দরিদ্র জনগণ যেখানে ছিলেন সেখানেই রয়েছেন। বরং নিত্যনতুন সংকট তাদের জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলেছে। এর মূল কারণ হলো যে-ব্যবস্থাকে এদেশের শাসকশ্রেণি বিগত ৫ দশকের বেশি সময় ধরে চালিয়ে এসেছে তার কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। শাসকশ্রেণি ও তাদের রাষ্ট্র-চরিত্রের কোনো পরিবর্তন হয়নি। মাঝে মাঝে কিছু কিছু রূপ বদল করে করে এটা চলছে। বুর্জোয়া রাজনীতি জনগণের আন্দোলন লড়াই অভ্যুত্থানের সাথে সর্বদাই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তারা শ্রমিক কৃষক জনগণের দাবি ও কর্মসূচিকে হয় আনেনি, নতুবা আটকে দিয়েছে। এজন্য এ নিপীড়িত শোষিত জনগণের কর্তব্য হলো বুর্জোয়া রাজনীতির থেকে মুক্ত শ্রমিক কৃষকের স্বতন্ত্র আন্দোলন গড়ে তোলা। আমরা নিচে বিভিন্ন সেক্টরে শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের প্রয়োজন ইস্যু ও পরিস্থিতিকে কিছুটা তুলে ধরবো।
শ্রমিক শ্রেণির জন্য নতুন পে-স্কেল চাই
সরকারি আমলা ও কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছে। কয়েক ধাপে তাদের বেতন প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের উচ্চবৃদ্ধির পরিস্থিতিতে এটা অন্যায্য নয়। তবে প্রথম দিককার গ্রেডের অফিসারদের বেতন এতটা বৃদ্ধি কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। যেখানে সরকারের অর্থ পরিস্থিতি ভালো নয়। প্রায় ২৬ লক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য বছরে ১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি অর্থ অতিরিক্ত লাগবে। যাহোক, আমলাতন্ত্রকে সরকার হাতে রাখতে চায়। কিন্তু আওয়ামী ও জামাত-ধর্মবাদী আমলারা কতটা বিএনপি’র পক্ষে আসবে সেটা আগামীতে দেখার।
অথচ কৃষকের জন্য বা স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাখাতে ভতুর্কির হার খুবই কম। আর শ্রমিক শ্রেণির কথা কি সরকারের মনে ছিল না? শুধুমাত্র গার্মেন্ট খাতেই ২৫ লক্ষের মতো নারী-শ্রমিকসহ প্রায় ৪০ লক্ষ শ্রমিক-কর্মচারী কর্মরত। গার্মেন্ট ছাড়া চা-শ্রমিক, অন্যান্য শিল্প-শ্রমিক, পরিবহণ শ্রমিক রয়েছেন প্রায় কোটি ছাড়িয়ে। তারা এখন বাজারে গিয়ে আরো বেশি করে মূল্যবৃদ্ধির খপ্পরে পড়বেন। কারণ, উপরোক্ত ১ লক্ষ কোটি টাকা এখন বাজারে আসবে, আর দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেবে। এ অবস্থায় তাদের জীবন-নির্বাহ করা আরো দুস্কর হয়ে পড়বে।
সরকার, বুর্জোয়া রাজনীতি, শাসকশ্রেণি ও রাষ্ট্র এই শ্রমিক-কৃষক-দরিদ্র ও সাধারণ জনগণের নয়, এটা এই পে-স্কেল থেকেই বোঝা যায়। তাই, শ্রমিক শ্রেণিকে তাদের জন্য নতুন পে-স্কেল ঘোষণার দাবিতে দ্রুত আন্দোলনের পথে নামতে হবে। আন্দোলন ছাড়া শ্রমিক শ্রেণি কখনো কোনো দাবি আদায় করতে পারেননি।
অটো রিক্সা বন্ধ করার চক্রান্ত রুখে দিন
ব্যাটারি চালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকার সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে চালক ও মালিকদের মধ্যে উদ্বেগ-ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এসব যান নিয়ন্ত্রণ, নিবন্ধন, চলাচলের এলাকা নির্ধারণ এবং উৎপাদন ও চার্জিং ব্যবস্থার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকার বলছে, যানজট, দুর্ঘটনা, বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও সড়কে বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের জন্য এসব পদক্ষেপ প্রয়োজন।
দেশে প্রায় ৬০/৮০ লক্ষ ও ঢাকা মহানগরে ১০/১৫ লক্ষ অটো রিক্সা রয়েছে বলে তথ্য জানানো হচ্ছে। এসবে কম করেও ১ কোটি মানুষ কর্মরত। একটি অটোর দাম দেড় লক্ষ টাকা ধরা হলে প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকা এখানে বিনিয়োজিত রয়েছে। কয়েক লক্ষ ছোটো মালিক এখানে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। দেশে যেখানে গুরুতর বেকার সমস্যা চলছে সেখানে এমন একটি শ্রম-ঘন খাত হঠাৎ করে বন্ধ করার লক্ষ্যে কেন এসব পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার?
বুর্জোয়া অর্থনীতির একটি মূল সূত্র হলো চাহিদা থাকলে সরবরাহ হয়। এই যে ৬০/৭০ লক্ষ অটো রিক্সা চলছে, তার বিরাট চাহিদা দেশে রয়েছে বলেই ব্যাঙের ছাতার মতো এর বিকাশ হয়েছে। সে চাহিদা হলো– সাধারণ মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে ব্যাপক জনগণের পরিবহণের চাহিদা। জনগণের এ প্রয়োজন রাষ্ট্র ও বুর্জোয়া শ্রেণি বিগত বছরগুলোতে মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলেই অটো রিক্সার এত ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।
অটো রিক্সার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো করা হচ্ছে এবং বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা দুই হাত তুলে যার পক্ষ-সমর্থন করছে সেগুলোর মধ্যে একটি হলো দুর্ঘটনা। কিন্তু বিআরটি’র সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ মোটর সাইকেল। তারপর রয়েছে ট্রাক, বাস......ইত্যাদি। অটো রিক্সা এখানে ৬নং স্থানে রয়েছে।
আরেকটি অভিযোগ হলো অটো রিক্সা রাস্তা দখল করে রেখেছে। প্রতিবেদন বলছে, রাস্তা ও জায়গা দখলের জন্য প্রধানত দায়ী প্রাইভেট কার।
কিন্তু অদ্ভূত বিষয় হলো, মোটর সাইকেল বা প্রাইভেট কার নিষিদ্ধের কোনো দাবি কেউ তুলছে না।
বিদ্যুতের ক্ষেত্রে বলা যায়, অটো চালকরা প্রত্যেকেই বিদ্যুতের জন্য দাম পরিশোধ করেন। সেটা আদায় করে গ্যারেজ মালিকরা। সে অর্থ রাষ্ট্র কেন তুলতে পারে না, কারণ, এ ধরনের গ্যারেজ মালিকদের একটা বড়ো অংশ হলো স্থানীয় ভাবে বুর্জোয়া দলগুলোর ভিত্তি। এ খাতে নাকি বিদ্যুতের ৪% খরচ হয়। এত বড় একটি কর্মক্ষেত্র যদি মাত্র ৪% বিদ্যুৎ খরচ করে, তাহলে আতঙ্কিত হবার কী আছে? গার্মেন্ট খাতে এর চেয়ে কম কর্ম-সংস্থান হয়েছে, কিন্তু তারা বিদ্যুৎ নিচ্ছে এর চেয়ে অনেক বেশি।
তাদের লাইসেন্স নেই। ঠিক আছে, আপনারা লাইসেন্স দিচ্ছেন না কেন? লাইসেন্স ফি এবং বাৎসরিক নবায়ন ফি দিয়ে সরকারও তো লাভবান হতে পারে। সেটা করছে না কেন?
এখন বলতে হয় যে, ভাত দেবার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই। প্রায় এক কোটি শ্রমজীবী মানুষকে এ রাষ্ট্র ও শাসকশ্রেণি উপযুক্ত কর্ম-সংস্থান করে দিতে পারে না। অথচ তাদেরকে বেকার করা, ছোট মালিকদেরকেও পথে বসানো, বিশাল জনগোষ্ঠীকে পরিবহণের সমস্যায় ফেলার কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে? জনগণের শত্রু বড়বুর্জোয়া গাড়ি-আমদানিকারক, গাড়ি-মালিক, আমলা ও সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থ রক্ষাই এর উদ্দেশ্য।
অটো রিক্সা শ্রমিক ও মালিকদেরকে যৌথভাবে এ চক্রান্তকে রুখে দিতে হবে।
পূনর্বাসনবিহীন হকার উচ্ছেদ মানি না
রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে অস্থায়ী দোকান এবং হকার উচ্ছেদ চলছে। গত জুলাইয়ের শুরু থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সংলগ্ন রাস্তার ফুটপাথে এবং রমনা কালীমন্দিরের সামনে থেকে হকার-অস্থায়ী দোকান উচ্ছেদ অভিযান চলমান। এর মধ্যে কয়েকজন হকার-দোকান কর্মচারীকে গ্রেফতার করে কারাদণ্ডও দেয়া হয়। একই সময়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, শহীদ মিনার এলাকা, প্রেস ক্লাব, জুরাইন, কারওয়ান বাজার মেট্রো স্টেশনের নিচেও হকারদের উচ্ছেদ করা হয়।
উচ্ছেদের কারণে ভবিষ্যৎ আয়-উপার্জন-কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা-উৎকণ্ঠায় আছেন এইসব হকাররা। অনেক হকারের যন্ত্রপাতি-গাড়ির ক্ষতির পরিমাণ লক্ষাধিক টাকা। ধরপাকড়-উচ্ছেদের সময় রাষ্ট্রের পুলিশবাহিনীর হাতে শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অনেকে।
জোরপূর্বক উচ্ছেদের মুখে বিভিন্ন জায়গায় দোকানদার-হকার-শ্রমিকদের প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযানের সময় পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে জুরাইনে গত ২৬ জুলাই হকাররা পুলিশের ওপর জুতা নিক্ষেপ করেন। এ ঘটনায় ২ জন হকারকে গ্রেফতার করা হয়।
কৃষিজমি সংকোচন এবং ফসল নষ্ট হওয়া, কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই, বেকারত্বসহ নানাবিধ সমস্যার মুখে হকার হওয়া বিশালসংখ্যক মানুষের জীবিকার কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না করে জোরপূর্বক উচ্ছেদে পরিষ্কার হয় প্রশাসন-সরকার-রাষ্ট্রের গণবিরোধী চরিত্র। হকারদের উচ্ছেদ করে শহরের নিম্ন আয়ের এবং মধ্যবিত্ত জনগণের প্রয়োজনের ওপরও চরম আঘাত করা হচ্ছে; তাদেরকে উচ্চমূল্যের সুপারমার্কেটের দিকে ঠেলে দিয়ে কর্পোরেট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে।
কর্পোরেট ব্যবসায়ীগোষ্ঠী, ধণিকশ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী রাষ্ট্রব্যবস্থা অটুট রেখে হকারসহ শ্রমজীবী এবং মধ্যবিত্তসহ নিপীড়িত জনগণের জীবনের সংকট নিরসন সম্ভব নয়। হকারসহ নিপীড়িত জনগণের বিদ্যমান এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিপ্লবী সংগ্রামের মাধ্যমে সমাজের আমূল পরিবর্তনেই কেবল মুক্তি সম্ভব।
সরকারি কল-কারখানা বেসরকারিকরণ চলবে না!
সম্প্রতি বিএনপি সরকার বন্ধ পাটকল-চিনিকলসহ ৪৪টি শিল্পকারখানা দেশি-বিদেশি লুটেরাদের হাতে তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতিমধ্যে দেশের শ্রমিক-জনতার তীব্র বিরোধিতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কয়েকটি পাটকল হস্তান্তরের গণবিরোধী চুক্তিও সেরে ফেলেছে। “বিনিয়োগ ও বেকারত্ব নিরসন”-এর নামে দশ হাজার একরেরও বেশি জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত শিল্প-কারখানা “পূনর্গঠন ও পুনউন্নয়ন” ইত্যাদি ভুয়া বয়ানে জনগণের এই বৃহৎ ভূমি-সম্পদ-অবকাঠামো পানির দরে দেশি-বিদেশি কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে সরকার। এর থেকে আমলারা হাতিয়ে নিচ্ছে শত শত কোটি টাকা। কিন্তু এ সব শিল্প-কারখানায় কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারী-ভোক্তাদের সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের নিকট জিম্মি করে ফেলা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এর প্রেসক্রিপশনে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে। দেশকে বেশি করে সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর করে তুলছে।
গার্মেন্টগুলোতে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ কর!
বর্তমানের বাংলাদেশে শাসকশ্রেণি ও সাম্রাজ্যবাদীরা গড়ে তুলেছে বিরাট গার্মেন্ট শিল্প সেক্টর। গার্মেন্ট শ্রমিকদের শ্রম শোষণ করেই দেশি-বিদেশি মালিকগোষ্ঠী কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছে। বিলাসী জীবন-যাপন করছে। স্থানীয় ভূমি-মালিকরা বাড়িওয়ালা বনে গেছে, আর তারা দরিদ্র শ্রমিকদের নিংড়ে নিয়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। অথচ শ্রমিকশ্রেণি অত্যন্ত মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।
৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর আওয়ামী মালিকরা অসংখ্য গার্মেন্ট বন্ধ করে শ্রমিকের বেতন পরিশোধ না করে পালিয়ে যায়। ইউনূস সরকার শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ ও তাদের কর্মসংস্থানের কোনো ব্যবস্থা না করে শ্রমিক আন্দোলনকে উল্টো সেনা ও পুলিশ লেলিয়ে দিয়ে হত্যাসহ অগণিত শ্রমিকদের রক্তাক্ত করে।
তথাকথিত নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও বন্ধ ফ্যাক্টরি চালু করা ও চাকরি হারানো শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। বরং প্রতিদিন ফ্যাক্টরিগুলো থেকে শত-সহস্র শ্রমিককে বিনা নোটিশে ছাঁটাই করে হচ্ছে। দ্বিগুণ তিনগুণ টার্গেট দিয়ে দুই জনের কাজ একজনকে দিয়ে করিয়ে দিচ্ছে। কোনো কোনো মালিক তো রোবট আমদানি করার হুমকি দিয়ে শ্রমিকদের আতঙ্কগ্রস্ত করে রাখছে।
চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনের পাশে দাঁড়ান
দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি, ভূমির অধিকার, শ্রমিক ইউনিয়নের গণতান্ত্রিক নির্বাচন, শ্রমিক-স্বার্থবিরোধী বিধান বাতিল এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার দাবিতে চা-শ্রমিকরা আন্দোলন করছেন। মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন চা-বাগানের শ্রমিকরা কর্মবিরতি-বিক্ষোভ-মানববন্ধন ও সমাবেশের মাধ্যমে তাদের দাবি তুলে ধরছেন। বর্তমানে চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১৮৭-১৯৬ টাকা। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে এই মজুরিতে চা-শ্রমিক ও তাদের পরিবার মধ্যযুগের ভূমিদাসদের মতো জীবন-যাপন করছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম চা-বাগানে বসবাস করলেও শ্রমিকদের বসতভিটার স্থায়ী মালিকানা নেই।
চা-শ্রমিকদের এই আন্দোলন কেবল মজুরি বৃদ্ধির দাবি নয়। এর সঙ্গে জড়িত শ্রমের মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, ভূমির অধিকার ও গণতান্ত্রিক শ্রমিক সংগঠনের প্রশ্ন। তাই চা-শ্রমিকদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখতে হবে। সকল প্রগতিশীল শক্তিকে আমরা চা-শ্রমিকদের আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি।
সার সংকটে কৃষকের নাভিশ্বাস
আমন মৌসুমে জমি প্রস্তুত ও চারা রোপণের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কৃষকেরা প্রয়োজনীয় ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার পাচ্ছেন না। কোথাও সার মিললেও সরকার-নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ফলে একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে সময়মতো সার প্রয়োগ করতে না পারায় ফসলের উৎপাদন নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় কৃষকরা সার কেনার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও সার পাচ্ছেন না।
সরকারি বরাদ্দের সার ডিলার সিন্ডিকেটরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে বিক্রি করছে। কোনো কোনো এলাকায় নির্ধারিত দামের তুলনায় প্রতি বস্তায় কয়েক’শ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিম্ন ও গরিব কৃষকেরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়ায় ক্ষুব্ধ কৃষকেরা গুদামের দরজা ভেঙে ১৯৭ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে গেছেন। যদিও প্রশাসনের ভয়ে অনেকেই পরে ফেরত দিয়েছেন।
কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে– দেশে সার সংকট নেই এবং পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। সরকার-দলীয় বা ক্ষমতার সাথে যুক্ত ডিলাররা সার মজুত করে বেশি দামে বিক্রির আশায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কৃষকদের হয়রানি করছে।
শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে এবং কৃষকের কর্মসূচির ভিত্তিতে সকল নিপীড়িত জনগণকে এই রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের লড়াই-সংগ্রামে শামিল হতে হবে।
আরও খবর
- শনি
- রোব
- সোম
- মঙ্গল
- বুধ
- বৃহ
- শুক্র